বিপ্রতীব দৃশ্যাবলী

রমণী (ফেব্রুয়ারী ২০১৮)

ফেরদৌস আলম
  • ৮৭
রাত্রির নিশানা যখন গভীরে নিমগ্ন হয়, যেটাকে রাত্রির কোমর ডিঙ্গিয়ে যাওয়া বলে - সেই সময়ও যখন দানা-পানিহীন অভুক্ত কেউ সূর্যের উদয় থেকে শুরু করে একটা শরীর নিয়ে একটা আলোকোজ্জ্বল শহরের ব্যস্ততম রাস্তাটির একপাশে টলমল করতে করতে হাটে, তখন তার কাছে মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে অন্ধকারময় বিষ-বাষ্পের শহরে সে হাটছে৷ চেহারায় তার সাক্ষাৎ নরকের দেখা মেলে তখন৷ অভিজাত হোটেলের আলো- আধারিতে বসে থাকা জুটি ধরা মানুষগুলোকে মনে হয় একেকটা নর-খাদক ! বাড়িতে ফেলে আসা কিছু অবুঝ শিশুদের হাড্ডিসার কঙ্কাল ছবি চোখে ভেসে উঠলে সে ভাবে, তাঁদেরও থাকা উচিত ছিল 'আত্মহত্যার অধিকার' ; ইশ্বরের পক্ষ থেকেই।

বাড়িতে যখন তার অবুঝ কান্নারত শিশুদের মুখে খাবার তুলে দিতে না পেরে স্ত্রীটি অঝোর ধারায় চোখের পানি ফেলে, জ্ঞানশূন্য হয়ে অবুঝ মানবশিশুগুলোর পিঠের উপর ধুপধুপ করে কিল মেরে তাড়িয়ে দেয় দূরে কোথাও আর বলে, 'মরতে পারিস না? দুনিয়ায় এত মানুষের মরণ হয়, তোদের হয়না?' তখন আগা-গোড়া কাঁথা মুড়ি দিয়ে এক বাস্তুহারা মানুষটি শহুরে ফুটপাতের কিনারটায় ঠিক কখন ঘুমিয়েছে - সে খবর নেয়ার বিন্দুমাত্র আগ্রহ কিংবা কৌতুহল পথচারীদের কারোরই হয়নি৷ দুদিন পরে যখন সেই কাঁথার নিচ থেকে একটা উৎকট-পচা নর-মাংসের গন্ধ পথচারীদের মস্তিষ্কে ঢুকে সবকিছু উলট-পালট করতে থাকে, তখন সিটি-কর্পোরেশনের কালচে ভুরিওয়ালা সুইপারটা লাশটি সরাতে সরাতে বলে, 'শালা, মরার আর জায়গা পেলি না?'

যে ছেলেটা তীব্র ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন একটা অন্ধকার ঘরে দিনের পর দিন নিজেকে বন্দী করে রাখে৷ রক্তের প্রতিটি কণার সাথে মেশাতে থাকে জীবন-বিধ্বংসী নেশার সমদ্র৷ মুহূর্তেই নাক সিটকায়ে দূরে সরে আসি আমরা, ঘৃণার দৃষ্টি নিয়ে বলি, কুলাঙ্গার ! পাপিষ্ঠ ! কিন্তু সেও জানে তার অতি প্রিয় আব্বু-আম্মু দুজনেই অত্যাধুনিক পৃথিবীতে বহুগামিতায় আসক্ত হয়ে যে যার মত ঘোর-লাগা আলোর ঝলকানির কোন এক মদের বারে ঝাঁঝালো নেশার ড্রেনে হাবুডুবু খাচ্ছে সেই একই সময়ে।
একটা ঘর্মাক্ত আত্মা পিঠে আর কপালে বিদ্ধ হওয়া গোটা চারেক গুলি নিয়ে বিশাল শূন্য এক নদীর চরে দিগ্বিদিক ছুটে পালচ্ছে! তার ধারণা খুনিরা এখনো তাকে পিছে পিছে তাড়া করে ফিরছে দাঁতালো হায়েনাদের মত! কিন্ত সে জানেনা তার মৃত্যু হয়েছে বেশ আগেই, যখন সে মনে করেছে - সে শুধু একটা আছাড় বা হোঁচট খেয়েছে মাত্র! অন্যদিকে বাড়িতে তার উদ্বেগাক্রান্ত মমতাময়ী মা’টা তখনো তার জন্য পরম যত্নে টেবিলে খাবার সাজাতে সাজাতে ভাবছে – এই বুঝি খোকা এল!
একটা অদ্ভুত রকমের সাঁজ দিয়ে লাস্যময়ী নারীটা যখন কোন এক ক্ষমতাধর অফিসারের দেহের নিচে সঁপে দেয় নিজেকে, পৃথিবীর জঘন্যতম ও আদিমতম যুদ্ধে নিজেকে শেষ করার জন্য, নিজের অস্তিত্বের সংকটে; তখন সে ভাবে অন্তত আগামীকাল কী খাব-সেই দুশ্চিন্তাটা আপাতত গেলো তো। শহরের অপর প্রান্তে সেই নরপশুর স্বাপ্নিক বঁধুটি কপালে টিপ দিতে দিতে ভাবে, আজ সে নিশ্চয় বলবে -‘তোমাকে আজ যা সুন্দর লাগছে না!’
চাকুরির বয়স শেষ হওয়ায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পাশ-করা যে হতাশ ছেলেটি ব্রিফকেসে ব্রাশ আর কলম ফেরি করে চলে। মূর্খ আর বেয়াদব দোকানদারদের দেয়া নিকৃষ্ট অপমান হজম করতে করতে ভাবে-গত দু ঈদের মত এবারের ঈদেও বাড়ি যাব না। এই মুখ আমি বাবা মাকে কীভাবে দেখাব? অথচ সে ভাবনাটা শেষ হতে না হতেই তার মোবাইলটা বেজে উঠে, বাড়ির ফোন। রিসিভ করার আগ-মুহূর্ত পর্যন্ত সে জানেনা, অপর পাশ থেকে তাকে বলা হবে, ছয় মাস ক্যান্সারে ভুগার পর তোমার বাবা এই মাত্র পৃথিবীর সকল মায়ার বন্ধন ছিন্ন করেছে। শুধু তোমার বাবার কড়া নিষেধ ছিল এইভাবে, ‘ ওকে এতকিছু জানাতে যেওনা, ও আরো বেশি দুশ্চিন্তা করবে!’
জ্যোৎস্নার মত শুভ্র রুপারা যখন হিমুদের নিয়ে কবিতার পর কবিতা লিখে ডায়েরি আর আর ফেসবুকের পাতা ভরিয়ে ফেলে সমস্ত আবেগ নিংড়ে দিয়ে। হিমুরা তখন হলুদ মুখোশ পরে একাধিক প্রোফাইল থেকে চ্যাটে ব্যস্ত থাকে আরো অন্য কিছু রুপাদের সাথে, মধ্যরাত্রির পরেও। হিমুদের বিশ্বাস, হিমুরা হিমালয়ের মত উদার, তারা কারো একার জন্য নয়, তারা সবার! হয়তো হুমায়ূন স্যারের বই থেকে এসব হিমুর জন্ম নয়; কোন এক সংক্রামক ভাইরাস থেকে তাদের জন্ম। পৃথিবীর সকল ভণ্ড হিমু কিংবা ডাইনী রুপাদের জন্য নারকীয় পৃথিবীর আগাম শুভেচ্ছা রইলো, রইলো ঘৃণা মিশ্রিত একরাশ, আকাশভরা অভিনন্দন!
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
সাদিক ইসলাম ভোট রইলো।
অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা রইল।
মোঃ নুরেআলম সিদ্দিকী চমৎকার গল্প। এগুলো কোন আবেগের কাহিনী নয়, সত্যিকার বাস্তব প্রকাশ। সমাজের এসব রুপায়িত চিত্রাঙ্কন একেবারে অহরহ। অসাধারণ লেগেছে, শুভকামনা...??
এরকম কমেন্ট পেলে লেখকের মন সত্যিই ভরে যায়!
সাদিক ইসলাম ভালো লাগলো। শব্দ চয়ন সুন্দর। নামকরণও। গল্পে আমন্ত্রণ।
ভণ্ড হিমু। ডাইনী রূপা ভুল বলেননি।
অনেক অনেক ভাল লাগল। কৃতজ্ঞতা রইলো।
ম নি র মো হা ম্ম দ ভোট ও শুভকামনা রইল।আসবেন আমার কবিতার পাতায় আমন্ত্রণ!
শুভকামনা রইলো আপনার জন্যেও।
মামুনুর রশীদ ভূঁইয়া বিপ্রতীপ, পৌণঃপৌনিক অথবা একান্তর ঘটনাবলীর সবগুলোই জীবনের প্রয়োজনে-তা অস্বীকার করার উপায় নেই; কিন্তু যেটি অস্বীকার করার উপায় নেই তা হলো-মানবিকতার বিপরীতে ঘটিত অমানবিকতার ঘটনাবলী। অশ্রুর বিপরীতে হাস্য কারোরই কাম্য নয়। ভালো লাগল গল্পটি। পছন্দ, ভোট ও শুভকামনা রইল। সময় পেলে আসবেন আমার গল্প ও কবিতার পাতায়।
শুভকামনা আপনার জন্যেও।
প্রজ্ঞা মৌসুমী বিপ্রতীব শব্দটার মানেটা মনে করতে পারছি না। তবে একেকটা দৃশ্য আর একটা দৃশ্যের সাথে আরেক দৃশ্যের সম্পর্ক বা বৈপরিত্য যে সাহিত্যিক সিম্ফনি তৈরি করেছে তাতে মনে হলো নামকরণ সার্থক। দৃশ্যগুলো জানা আমাদের তবু একসাথে গভীরে বেজে গেছে।

২৬ ফেব্রুয়ারী - ২০১৬ গল্প/কবিতা: ১৮ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "স্বাধীনতা”
কবিতার বিষয় "স্বাধীনতা”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ ফেব্রুয়ারী,২০২৬