আমার তোমার মায়ের ভাষা বাংলা ভাষা

মাতৃভাষা (ফেব্রুয়ারী ২০২৬)

Adnan Khalid Shammo
  • 0
  • ৩১
সাল ১৯৫২,২৩ই ফেব্রুয়ারী, রাত দুইটা ছাব্বিশ মিনিট, ঢাকার সবচেয়ে ব্যাস্ত সড়কটাতে তেমন ব্যাস্ততা ছিলো না। কেবলমাত্র দু-একটি গাড়ি ধীরেসুস্থে এগিয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে। একটা গাড়ি এসে থামলো রাস্তার ডাস্টবিনের সা একটা পনেরো বছরের ছেলে নেমে এলো গাড়ি থেকে, হাতে একটা খালি পানির বোতল। তার মা গাড়ির জানালা দি বাড়িয়ে দেখদিলো। মহিলাটার চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। চোখের নিচে কালো দাগ স্পষ্ট। একটা স্ট্রিটলাইট নিতু করছে, জলন্ত বাতিগুলোর আশেপাশে পোকা ঘুরঘুর করছে। রাস্তার পাশে একটা কুকুর ঘুমাচ্ছে।

হঠাৎ একটা প্রচন্ড চিৎকারে আকাশ বাতাস কেপে উঠলো যেন। কুকুর টা চমকে উঠে ঘেউ ঘেউ করতে লাগলো তার ছেলেটা ভয় পেয়ে এক লাফে গাড়িতে উঠে পড়লো, ড্রাইভার গাড়িটা চালাতে শুরু করলো।

ছেলেটার বাবা নামকরা ব্যাবসায়ী। জিজ্ঞেস করলেন, বাবা, কি হয়েছে? হঠাৎ চেচিয়ে উঠলে যে?

ছেলেটা তখনো কাপছে।

লোকটা বললো, কান্তি ওকে জল দাও। বোতলে জল আছে না?, দাও।

বলা বাহুল্য কান্তি সেই ছেলেটির মা

পানি খেতে গিয়ে হাত কাপছিলো ছেলেটির। হঠাৎ বোতল উলটে তার প্যান্টে পড়ে ভিজে গেলো। যা সে দেখেছে তা তা ঘুম হারাম করবে নিশ্চিত। প্রায় ৫ মিনিট পর সে ঠান্ডা হলো, বললো যে ডাস্টবিনে বোতলটা ফেলতে গিয়ে সে সেখানে মানুষের লাশ দেখতে পেয়েছে। রক্তমাখা লাশ।

আসলে ২০ তারিখ তারা বিদেশে ছিল, আজই বাসায় ফিরেছে। ২১ তারিখ যে কি ঘটেছে তা তারা কেউই জানেন

না। তাদের আনানো হয়নি। পাকিস্তান সরকার সব মাধ্যম বন্ধ রেখেছিলো। ছেলেটার বাবা একটা পত্রিকার অফিসে ফো দিয়ে আনতে চাইলেন ব্যাপার কী?

জানতে পারলেন ২১ তারিখ বাংলা ভাষার সম্মান রক্ষার্থে রাস্তায় নামা ছাত্র-জনতাদের পুলিশ গুলি করে হত্যা করেছে। শহিদদের উপর সম্মান ও সরকারের প্রতি ক্ষোভ প্রদর্শন মিছিলে পুলিশ গুলি করে আরও বেশ কয়েকজনকে মেরে ফেলেছে। বিভিন্ন জায়গায় লাশ ফেলছে তারা, এই ডাস্টবিনেও হয়তো তারা একটা লাশ ফেলেছে।

বাসায় যেতে যেতে ৭টা বাজলো, ছেলেটা এক ঘুম দিয়ে উঠলো সাড়ে বারোটায়। রাতে যা হয়েছে তা সে ভুলে যেতে যাদে তবে যন্ত্রনা ভোলা সহজ নয়।

আজ স্কুলে যেতে হবে। সে ব্যাগ গোছালো। স্কুলে গিয়েই এক বন্ধুর সাথে দেখা,সে এমন একটা কথা বললো যাতে তার মন আরও খারাপ হয়ে গেলো।

বললো তার দিদিও ২২ তারিখের মিছিলে ছিলো। তাকে খুজে পাওয়া যাচ্ছে না, বাবা-মা খুব চিন্তিত হয়ে গেছেন। পুলিশ ইনভলভড হযেছে, কোন হদিশ মেলেনি, কিছু কিছু জায়গায় পাওয়া গেছে চুলের গোছা। তা যখন বাবা-মার হাতে তুলে

দেওয়া হলো তখন তারা তা চিনতে ভুল করলেন না। ২১ তারিখে গণহত্যার খবর শুনে সে খুব কাদছিলো। মা তাকে শারা করার জন্য তার মাথায় তেল দিয়ে দিয়েদিলেন। সেই ঘ্রাণ এখনো লেগে আছে, যতটুকু চুল পাওয়া গেছে তাতেই আর সন্দে থাকে না যে রাত্রির মাথায় আর একটাও চুল নেই। এতদিনে যে সম্ভ্রম হারিযেছে তাও নিশ্চিত।

বলা বাহুল্য, মেয়েটা সজিবের বড় ভাইয়ের ক্লাসমেট। সজিব হলো সেই মেলেটা যে ডাস্টবিনে লাশ দেখেদিলো। তার বন্ধুর নাম আকাশ, তার দিদির নাম রাত্রি।

মজিবের বাবা বেশ চিন্তিত, তার বড় ছেলের হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। বাবাকে সে কথা দিয়েছিলো যে সে এসব আন্দোলনে যোগ দেবে না. পড়াশোনা করবে তবে সে বাধ্য হয়েছিলো নিজের বাবাকে মিথ্যা বলতে কারণ সে অনেক আগে থেকেই এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত খিলো। ২৬ তারিখের নিখিলেও সে মিল, তারপর তার বন্ধুরা তাকে আর খুঁজে পাচ্ছে না, আবার তার বাবা-মার খবর না আনার নিখোঁজ হবার খবরটাও আনাতে পারছে না।

আর বলবে কিভাবে?

তারা তো তাদেরকেই দোষ দেবেন যে তোমরা থাকতে আমার ছেলে নিখোঁজ হলো কিভাবে? কেমন বন্ধু তোমরা।

একটা আশংকায় বন্ধুরাও কেপে কেপে উঠছে। তার বেচে থাকা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ আছে। নিখোঁজ হয়েছে দুইদিন। তাকে বাচিয়ে রাখার সম্ভাবনা খুবই কম।

একদিন সজিব বাসার পাশের পার্কে গিয়েছিলো একা-একা। সেখানে একটা ছোট নদীর মতো আছে, তার হাতে মানিক বন্দোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস পদ্মা নদীর মাঝি। পানিতে পা ডুবিয়ে বসে মাঝিদের গল্প পড়ার মাঝে আনন্দ আছে নিশ্চয়। ভাইয়ের চিন্তা, সেই ডাস্টবিনের লাশ এগুলো ভুলতেই এই উদ্যোগ। কয়েকদিন ধরে মাখাটা প্রচন্ড ধরেছে। বই পড়লে যদি মাখাটা ঠান্ডা হয়।

তবে তার আশা আর পূরণ হলো না। নদীতে যা দেখলো তাতেই তার মাথা ধরা চার-পাঁচগুণ বেড়ে যেতে বাধ্য। নদীতে লাশ ভেসে উঠেছে। বিকৃত, নগ্ন লাশ। তাদের বুকে গুলির চিহ্ন স্পষ্ট। সে মুখ ঢেকে বসে পড়লো। তার পা দিয়ে গড়িয়ে পড়লো একটা গরম জলের স্রোত।

এখন এই ভেজা প্যান্ট নিয়ে সে বাসায় যাবে কি করে। লোকে বলবে কী? এখানে বসে থাকাটাও নিরাপদ না, যেভাবেই হোক বাড়িতে তার ফিরতেই হবে, তবে শরীর যে চলতে চায়না, মাথাই খালি কাজ করছে, যা দেখেছে তাতে তার শরীর শক্ত হয়ে গিয়েছে, একটু পর মস্তিস্কটাও নিস্তেজ হয়ে গেলো।

ঘুম ভেঙে দেখলো সে বাসার বিদ্বানায়, বইটা পাশে রাখে, সে কাথার নিচে সম্পূর্ন নগ্ন অবস্থায় শুয়ে আছে। তখন ঘরে কেউ প্রবেশ করলো, মিতু দিদি। তার ভাইয়ের আরেক ক্লাসমেট। কিছুটা লজ্জা পেলো।

এই মিতুই তাকে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে দেখে কোলে করে তুলে এনেছে। সে উঠে বসলো।

মিতুর হাতে জল,

সে জিজ্ঞেস করলো, জল খাবি?

দাও দিণি

এক চুমুকে সে সবটুকু অল শেষ করলো।

হঠাৎ বাসার বাইরে একটা গোলমালের শব্দ পাওয়া গেলো। সজিব হঠাৎ তার মায়ের গলা শুনতে পেলো,

সোনামানিক আমার, কি হয়েছে তোর? কথা বলছিস না কেন?

মিতুও হঠাৎ শব্দে চমকে উঠলো।

মজিব নিজের অবস্থা ভুলে গিয়ে ছুটে নিচে চলে গেলো, মিতুও দিদ্দন দিদ্দন গেলো, যেয়ে দেখলো একটা কাঠের পাটাতনে একটা লাশ পড়ে আছে। সজিবের ভাইয়ের লাশ। তার বন্ধুরা বলছে, আংকেল আন্টি, আমাদের মাফ করবেন আমরা ওকে বাচাতে পারিনি। আমাদের মাফ করবেন। কান্তি কথা বলছে না.ভার খেলে যে কোনা কথা বলছে না তা তার মাথায় ঢুকছে

না।সে চেচিয়ে উঠলো

ছেলে কথা বলছে না কেন?সে যে সারাদিন কথা বসতো?

হায়, কান্তি ভুলে গেছে যে মরা মানুষ কথা বলতে পারে না।

মজিবের ভাইমের লাশটা সম্পূর্ণ উলঙ্গ, আর তার মাথাটা ধড় থেকে আলাদা করা, মিতু দেখানতেই হাত দিয়ে চোখ ঢেকে মেলেখে, এটা সে দেখতে পারবে না। সাখে আমে সজিবের বন্ধুর দিদি রাত্রি, সে বেচে গিয়েছিলো কোনমতে তবে মাথার চুল হারিযেছে, মাখায় একটাও চুল নেই। আর সেই সাথে হারিয়েছে সপ্তম। সেও চোখ ঢেকে রেখেছে।

মজিবের মুখ দিয়ে একটা কাতর খেদোক্তি বেরিয়ে এলো। শোকে সে পাগল হয়ে গেলো। এক ছুটে বেড়িয়ে গেলো নিরুদ্দেশের দিকে। সে যে কোথায় গোলা তা কেউ জানে না। কয়েকদিন পর দঘীতে আরও একটা লাশ পাওয়া গেলো
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
ফয়জুল মহী দারুণ ছন্দময় অসাধারণ শ্রুতিমধুর লেখনি পাঠে মুগ্ধ হলাম শুভকামনা রইল।

লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

সাল ১৯৫২,২৩ই ফেব্রুয়ারী, রাত দুইটা ছাব্বিশ মিনিট, ঢাকার সবচেয়ে ব্যাস্ত সড়কটাতে তেমন ব্যাস্ততা ছিলো না

২২ জানুয়ারী - ২০২৬ গল্প/কবিতা: ১ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "স্বাধীনতা”
কবিতার বিষয় "স্বাধীনতা”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ ফেব্রুয়ারী,২০২৬