সনাক্তহীন

রহস্য (এপ্রিল ২০২৬)

শাহীন আল মামুন
  • 0
  • ৯৫
শহরের ব্যস্ততম ফ্লাইওভারের নিচে লাশটি প্রথম দেখা যায় ভোরের আলো ফোটার আগে। এক টুকরো পুরোনো চাদর গায়ে জড়ানো, মুখে অদ্ভুত শান্তি—যেন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কে সে? কোথা থেকে এসেছে? কেউ জানে না। পকেটে কোনো পরিচয়পত্র নেই, নেই মোবাইল ফোন, নেই এমন কিছু যা তাকে কোনো নাম দেবে। সে শুধু একটি লাশ—সনাক্তহীন।
সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় জমতে লাগল। পুলিশ এলো, সাংবাদিক এলো, কৌতূহলী জনতা এলো। কেউ বলল, “দেখে তো মুসলমান মনে হয়, দাড়ি আছে।” আরেকজন প্রতিবাদ করল, “না, কপালে হালকা সিঁদুরের দাগের মতো কিছু আছে, হয়তো হিন্দু।” কেউ বলল, “গলায় ক্রস থাকলে বুঝতাম খ্রিষ্টান।” আরেকজন যুক্তি দিল, “মানুষ তো, ধর্ম দেখে বোঝা যায় নাকি!”
বিতর্ক দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠল। পাশের মসজিদের ইমাম সাহেব এসে বললেন, “যদি মুসলমান হয়, তবে জানাজা পড়ে কবর দিতে হবে।” মন্দিরের পুরোহিত বললেন, “যদি হিন্দু হয়, তবে দাহই তার শাস্ত্রসম্মত গতি।” গির্জার ফাদার নরম গলায় বললেন, “পরিচয় জানা জরুরি, তা না হলে নিয়ম ভঙ্গ হবে।” প্রত্যেকে নিজের ধর্মীয় বিধান তুলে ধরলেন, কিন্তু কেউ নিশ্চিত করতে পারলেন না—সে কোন ধর্মের মানুষ।
লাশটি ততক্ষণে রোদে পড়ে আছে। দুপুরের সূর্য তার নিথর শরীরকে আরও নির্জীব করে তুলছে। পুলিশ সিদ্ধান্তহীনতায় সময় কাটাচ্ছে; ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ আসেনি। ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে আলোচনা সভা বসে গেল। যুক্তি, পাল্টা যুক্তি, শাস্ত্রের উদ্ধৃতি, ঐতিহ্যের উদাহরণ—সবই উঠে এল। কিন্তু লাশটি নিঃশব্দ।
দ্বিতীয় দিন গড়াল। শহরের মানুষজন বিরক্ত হতে শুরু করল। দুর্গন্ধ ছড়াতে লাগল চারদিকে। দোকানিরা নাক চেপে ধরছে, পথচারীরা দ্রুত পা বাড়াচ্ছে। কেউ বলল, “এভাবে রাখা ঠিক না।” কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন বলে উঠল, “ধর্মের ব্যাপার, ভুল হলে পাপ হবে।” পাপের ভয়ে মানবতার কাজটি স্থগিত রইল।
তৃতীয় দিনের সকালে দুর্গন্ধ অসহ্য হয়ে উঠল। মাছি ভনভন করছে, কুকুরেরা ঘুরঘুর করছে। ধর্মীয় নেতারা আর আসেন না; জনতার ভিড়ও কমে গেছে। যে লাশটিকে নিয়ে এত তর্ক, এত উত্তেজনা—সে এখন শুধু একটি পচতে থাকা দেহ।
শেষ পর্যন্ত শহরের কয়েকজন সাধারণ মানুষ—রিকশাচালক, দোকানি, এক কলেজপড়ুয়া মেয়ে—মুখে কাপড় বেঁধে এগিয়ে এল। তারা বলল না সে মুসলমান না হিন্দু, খ্রিষ্টান না অন্য কিছু। তারা শুধু বলল, -“সে মানুষ ছিল।”
পুলিশের সহায়তায় তারা একটি গর্ত খুঁড়ল শহরের প্রান্তে। কোনো ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া, কোনো বিশেষ প্রার্থনা ছাড়া, তারা নিঃশব্দে তাকে মাটির নিচে শুইয়ে দিল। কেউ মন্ত্র পড়ল না, কেউ আজান দিল না, কেউ স্তোত্র গাইল না। তবু সেই মুহূর্তে যেন বাতাসে এক গভীর প্রার্থনা ভেসে উঠল—মানুষের প্রার্থনা।
ফিরে আসার পথে কলেজপড়ুয়া মেয়েটি বলল, “আমরা তাকে নাম দিতে পারিনি, ধর্মও দিতে পারিনি। কিন্তু মানুষ হিসেবে বিদায় দিতে পেরেছি।”
শহর আবার ব্যস্ত হয়ে উঠল। ফ্লাইওভারের নিচে আর কোনো লাশ নেই, নেই কোনো তর্ক। কিন্তু বাতাসে থেকে গেল এক অদৃশ্য প্রশ্ন—আমরা কি আগে মানুষ, না আগে ধর্ম?
সনাক্তহীন সেই মানুষটির মৃত্যু শহরকে শিখিয়ে গেল—ধর্ম মানুষকে পথ দেখাতে পারে, কিন্তু মানবতা না থাকলে সেই পথ অন্ধকারেই হারিয়ে যায়।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
শাহীন আল মামুন আপনার মন্তব্যের সঙ্গে আমিও একমত।
ফয়জুল মহী অসাধারণ সুন্দর লেখা, চমৎকার প্রতিটা শব্দ ও লাইন। এককথায় অনবদ্য সুন্দর প্রকাশ ; মুগ্ধ হলাম..
সাদিয়া আক্তার রিমি লাশ পাওয়া গেলে পুলিশ সবার প্রথমে মর্গে নিয়ে যায়, ময়নাতদন্ত শেষে জানা যায় তার মৃত্যুর কারণ। লাশের ছবি পত্রিকায় দিলে শুধু মৃত ব্যাক্তির ধর্ম নয়, বরং তার পুরো জন্মকুণ্ডলী বের হয়ে যেত। লাশটা কোন ধর্মের অনুসারীর তা নির্ধারণ করার জন্য এযুগে কেউ লাশ ঘটনাস্থলে ফেলে রেখে লাশ পচায় না। অন্তত এমন ঘটনা আমি কখনো শুনিনি। এমন ঘটনা ঘটতো ইংরেজদের আমলে,দূর্ভিক্ষের সময় বা যুদ্ধের সময়। কিছু মনে করবেন না, বর্তমান যুগে এমন ঘটনা ঘটে না। বর্তমানে খুন করে কোন গোপন জায়গায় লাশ গুম করার ঘটনা ঘটে থাকে কিন্তু রাস্তায় পড়ে থাকা লাশের ধর্ম সনাক্ত করতে পারেনি বলে সেই লাশ রাস্তায় ফেলে রেখে পচাবে এমন ঘটনা এ যুগে বিরল। আশা করি বর্তমান যুগের সাথে মানানসই, যুগোপযোগী ও বাস্তবধর্মী লেখা আমরা পরবর্তী সংখ্যাগুলোতে পাব
ব্যাপারটা আমিও ভাবছিলাম। আমরা নিয়মের মধ্যেও অনেক অনিয়ম করি। আর সেগুলো নিয়মের দোহাই দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যাই।
আপনি কি আমার মন্তব্যের সঙ্গে একমত? লাশের ধর্ম সনাক্ত করতে না পারা, লাশ রাস্তায় ফেলে রেখে পচানো, লাশের দাফন করার যে পদ্ধতি দেখানো হয়েছে সেটা পুরোটাই বর্তমান যুগের সঙ্গে বেমানান ও অযৌক্তিক।

লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

শহরের ব্যস্ততম ফ্লাইওভারের নিচে লাশটি প্রথম দেখা যায় ভোরের আলো ফোটার আগে।

১২ মার্চ - ২০২৬ গল্প/কবিতা: ১ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ”
কবিতার বিষয় "তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ এপ্রিল,২০২৬