গান

পরিবার (এপ্রিল ২০১৩)

মোহাম্মদ ওয়াহিদ হুসাইন
  • ১০
  • ৬০
‘শিখতে হলে শ্রদ্ধা ভক্তি আর আন্তরিকতা থাকতে হবে,’গুরুদয়াল ডান হাতটা হারমোনিয়ামের রিডের উপর থেকে উঠিয়ে তর্জনী দিয়ে নাকের উপরের চশমাটা ঠিক করে বসিয়ে নিল। তারপর তার সামনে বসে থাকা তিন কন্যার দিকে এক এক করে তাকিয়ে দেখে নিল। তার শীর্ণ মুখে একটা তৃপ্তি আর আনন্দের আভাস। ‘আর সেই সাথে থাকতে হবে...কী থাকতে হবে?’
‘অধ্যবসায় আর একাগ্রতা...।’হারমোনিয়ামের ব্লোর ছিদ্রের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে মালতি বলল। সে তার কোলে বসে থাকা যূঁথিকাকে দুই হাতে জড়িয়ে বসে আছে।
মালতির বাম কাঁধের সাথে কাঁধ ঠেকিয়ে একরকম ঠেস দিয়ে বসে আছে কেতকী।
‘ঠিক,’ দ্রুত কয়েকবার ব্লো করে হারমোনিয়ামের রিডে আঙ্গুল রাখল গুরুদয়াল।

...স ঋ জ্ঞ ম প ধ ণ সঃ সঃ ণ ধ প ম জ্ঞ ঋ স...। হারমনিয়াম গেয়ে উঠল।...ম জ্ঞ ম জ্ঞ ঋ স ঋ ণ্ স...।
‘নাও, ধর... খ... ব রি য়া চৈ ন নে হি ঘ ড়ি প ল উ ন বি ন...।’প... ম জ্ঞ ঋ স স দ প দ ম প মজ্ঞ ম জ্ঞ ঋ স ঋ...। ‘...ব রি য়া...।’

মাটির মেঝে, টিনের চাল আর বেড়ার ঘরটা মাঝারি আকারের।দক্ষিণ দিকে দুটো জানালা, দুটোই খোলা। পূব দিকে প্রায় মাঝখানে দরজা আর তার দুপাশে দুটো জানালা। বিপরীত দিকের দেওয়ালে ভিতরে যাওয়ার দরজা। তার পাশে একটা জানালা আছে, সেটা বন্ধ। সেদিকে কোনার কাছে একটা আলনা, পাশেই একটা কাঠের আলমারি। ডান দিকের জানালার সাথে বড় আকারের একটা কাঠের চৌকি, তোশক আর চাদর পাতা আছে। বালিশ দুটো এক কোনায় সরিয়ে রাখা হয়েছে।

চৌকির উপরে জানালার কাছে গুরুদয়াল পদ্মাসনে বসে আছে- হারমোনিয়ামটা থেকে প্রায় হাত দুয়েক দূরে বসেছে ছাত্রী তিনজন, তার আত্মজা।
... জ্ঞ ঋ স ঋ...। ...স জ্ঞজ্ঞ ঋ জ্ঞ া সা ঋ ণ্ সঋ জ্ঞম পদ ণসঃ ণদ পম জ্ঞঋ সণ্...।

মালতি তার ছোট বোনের কাঁধে বাম হাত তুলে দিল। সে এখনো এক দৃষ্টিতে ব্লোর ছিদ্রের দিকে তাকিয়ে থেকে গান গেয়ে চলেছে। তার গানের গলা মিষ্টি, কিন্তু সে কখনই গলা ছেড়ে গান গায় না, অন্তত নিজের বোনদের ছাড়া আর কারো উপস্থিতিতে নয়। তার বাবা বারবার বলেছে, কোন কাজ হয়নি বরং যত বলা হয় ততই তার গলার স্বর নিচু হতে থাকে।

মালতির চেয়ে তিন বছরের ছোট কেতকী গত মাসে বার বছরে পা দিয়েছে। লাল নীল আর বেগুনি ফুলের ছাপ আঁকা, হাতে আর বুকের কাছে ঝালর দেওয়া সালোয়ার কামিজ পরে আছে সে। পুরানো আর মলিন। রাত্রে এগুলো পরেই সে ঘুমিয়েছিল। তার যদি ইচ্ছা হয় তবে হয়তো দুপুরে স্নানের পরে অন্য পোশাক পরবে। তবে সে সাধারণত যা পরে থাকে, তার কোনটাই এর চেয়ে খুব একটা উন্নত মানের নয়। বেটেখাটো গড়নের শ্যামলা মেয়েটা কারো কথা শোনার পাত্রী নয়, আর সে পোশাকের রূপ নিয়ে বেশি একটা মাথা ঘামায় না। বনে বাদাড়ে আর খাল বিলে ঘুরে বেড়ানো তার স্বভাব। যখন তখন যাবে আর যখন তখন ফিরে আসবে। পোশাকের প্রতি মমতা দেখাতে গেলে সেটা সম্ভব নয়। একমাত্র মায়ের কোন কথা সে ফেলতো না, কিন্তু মা গত হয়েছেন দেড় বছর।

কেতকীর কন্ঠস্বর মেয়েদের তুলনায় একটু মোটা- চোখ বন্ধ করে শুনলে মনে হবে যেন অল্প বয়সী কোন ছেলে। ভরাট আর অচঞ্চল গলা পরিণত গায়কের কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু একটু অস্থির ধরণের মেয়েটার মনোযোগ কম। তবে এই মেয়েটার কারণেই তাদের বাবা তাদেরকে গান শেখানো শুরু করেছে, তাও মাত্র মাস দুয়েক...।

কিছুটা আত্মভোলা বাবা কোন দিনই তাদের কাছে সহজ লভ্য ছিলনা। এদের মা যতদিন বেঁচেছিলেন, তার কাজ ছিল গান বাজনার আসরে থেকে, অথবা গানের খোঁজে ঘুরে দিন আর রাতের অনেকটা অংশ বাইরে কাটিয়ে আসা। সামান্য কিছু ফসলের জমি থাকার কারণে তারা যেটা পেত, সেই মহিলা তাই দিয়ে কোন একভাবে সংসার চালিয়ে নিতেন। তিনি মারা যাওয়ার পরে গুরুদয়ালের দিশাহার অবস্থার একটা দিনে তারই এক গান ভক্ত আড়তের মালিক নিজের আড়তে তাকে একটা কাজে জুড়ে দেয়। দৈহিক দিক দিয়ে দুর্বল মানুষটা সেখানে যে কাজ করে সেটাকে কাজ না বলে সময় কাটানো বলা যেতে পারে। তবে সে সেটা পুষিয়ে দেয় যখন মালিকের বাড়িতে কোন আসর বসে। তখন সে সেখানে উপস্থিত থেকে বাদক বা গায়কের সাথে সংগত দিয়ে থাকে বা নিজে গান গায়। আর সেটা সেখানে প্রায়ই হয়ে থাকে।

এসো নীপবনে...যূঁথি মালা গলে...এসো নীপবনে...। হঠাত তার তন্দ্রা ছুটে গেল। একটা কিশোর কণ্ঠ তার ঘরের পাশ দিয়ে রান্না ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। টিনের চালের বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ যেন তার গানের সাথে তাল দিয়ে চলেছে।

গুরুদয়াল জানে মালতি রান্নার কাজে ব্যস্ত। কেতকীকে ঘণ্টা কয়েক আগে বাইরে যেতে দেখেছে আর ছোটটা রান্নাঘরের সামনের বারান্দায় পুতুল খেলছিল। সে কনুয়ে ভর দিয়ে উঁচু হল। কে? তার অভিজ্ঞ মন বুঝে নিতে পারল গড়তে পারলে এটা একটা দারুণ গলা হতে পারে।

...বরষন জলে... এসো...।
‘মালতি,’সে তার বড় মেয়েকে ডাকল। সাথে সাথেই গান বন্ধ। আর কোন উত্তর পাবার আগেই সে জানালার ফাঁক দিয়ে দেখতে পেল কেতকী ছুটে বাড়ির সীমানা থেকে বের হয়ে গেল। তার সারা শরীর ভেজা আর কাদার দাগ।

‘বাবা, ডাকছিলে? কিছু লাগবে?’মালতি শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে ভিতরের দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকল। তার চোখে মুখে উৎকণ্ঠার আভাস।
‘কে গান গাচ্ছিল, মালতি?’
‘কেতকী,’মালতি বিব্রত ভাবে জবাব দিল। ‘বাবা, তুমি রাগ কোরনা,’সে বলল। ‘তুমি ঘরে ঘুমাচ্ছ, তা সে জানতো না। জানলে...।’লজ্জা আর বেদনায় গুরুদয়ালের মুখ লাল হয়ে উঠল।
‘না মা, আমি রাগ করিনি।’সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ‘আমার কাছে তোরা গান শিখবি, মা?’তার কন্ঠে যেন অনুনয়। আনন্দে মালতির চোখে পানি এসে গেল। সে আঁচলে চোখ মুছল। বলতে গেলে তারা তাদের বাবার গান শোনেনি কিন্তু তার গানের সুনামের কথা তাদের অজানা নয়। তার মুখ দিয়ে কোন কথা বের হল না, শুধু মাথা নাড়াতে পারল।
‘মা, ছাতিটা নিয়ে গিয়ে কেতকীকে ডেকে নিয়ে আসতে পারবি না? আমি রাগ করিনি, আমি খুশি হয়েছি... তোরা তোদের মায়ের মত না, সে... আমি জানতাম না যে তোরা গান পছন্দ করিস...।’
মালতি পিছন ফিরে একবার চোখের আড়ালে থাকা রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে আলনায় ঝুলিয়ে রাখা ছাতাটা নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

...কাজে যোগ দিয়ে এদের গানের বিষয়ে তার কর্মদাতাকে বলতেই তার বাড়িতে পড়ে থাকা একটা সিঙ্গেল রিডের হারমোনিয়াম এনে দেওয়া হল। রিডগুলো জারমানি। তার মেয়ের গানে হাতেখড়ির সময় এটা কেনা হয়েছিল। বছর বা মাস নয়, মাত্র কয়েক দিন পরেই মেয়ে তার বাবাকে দিয়ে একটা স্কেল চেঞ্জিং হারমোনিয়াম কিনিয়ে আগেরটাকে বাদ দিয়েছিল। মেয়েকে সে কোন ভাবেই বোঝাতে পারেনি যে প্রাথমিক অবস্থায় তার জন্য সিঙ্গেল রিডের হারমোনিয়ামই ভাল হবে।

সেই সাথে গুরুদয়ালকে বাড়ির জন্য ছোট একটা ট্রানজিস্টার রেডিও দেওয়া হল। এটাও পড়েছিল। মেয়ের জন্য কেনা হয়েছিল। তার পছন্দ এখন রেডিও নয়, রেডিও-গ্রাম।

‘বুঝলে হে দয়াল,’যতিনবাবু হাসতে হাসতে তাকে বলেছিল। ‘চারটে করে ব্যাটারি লাগে, সেটা কিন্তু তোমাকেই কিনে নিতে হবে।’
‘আজ্ঞে।’এমন দুটো জিনিস পেয়ে গুরুদয়াল আনন্দিত আর কৃতজ্ঞও বটে।
‘তবে এবারেরটা আমিই নাহয় দিয়ে দিলাম। আমার মা লক্ষ্মীরা এটা চালাবে তো...। আর হ্যা, কাজ একটু কমলে হারমোনিয়ামটা বাদ্য নিকেতনে নিয়ে গিয়ে আমার নাম করে টিউনিং আর লিক টিক আছে কিনা সে সব চেক করিয়ে আনবে।’
‘আজ্ঞে।’

...কেতকীর হাত পা চোখের দৃষ্টি কোনটাই স্থির নয়। মাঝে মাঝেই সে কাঁধ দিয়ে তার দিদিকে হালকা ধাক্কা দিচ্ছে। তার দুজন দুলে দুলে উঠছে। কিন্তু সেটা গানের তালের সাথে তাল মিলিয়ে।

কিন্তু কেতকীর গলায় গান তুলে নেবার ক্ষমতা এক কথায় অসাধারণ! মাত্র কয়েকবার শুনেই সে কঠিন কঠিন গানও তুলে নিতে পারে যা মালতির কাছে একটা অসম্ভব কিছু। অথচ সে গান গাইবে খুব কম। আর মালতি প্রায় সারাটা দিনই গুনগুন করছে, মাঝে মাঝে বাবা না থাকলে গলা ছেড়ে। তাকে বাড়ির প্রায় সব কাজই করতে হয়, গান যেন তার কাজের কষ্ট ভুলিয়ে দেয়। শুনতে খারাপ লাগেনা এদের।

যুঁথির বয়স চার বছরের মত। ঝাঁকড়া চুলের মিষ্টি মেয়েটার এদের সাথে তাল মিলিয়ে গান গাওয়ার বয়স এখনো হয়নি সম্ভবত। তার সপ্তক এখনো এদের তুলনায় নিচে পড়ে আছে, কিন্তু একসাথে গান গাওয়ার চেয়ে আনন্দের আর কিছু বোধ হয় তার কাছে নেই। একা একা সে কখনো গাইবে না, শুনতে কখনই আপত্তি নেই। রেডিওটা বেশ কিছু দিন ব্যাটারির অভাবে বন্ধ পড়ে আছে, কাজেই রাত্রে তাকে ঘুম পাড়াতে হলে দিদিদের একজনকে গান গাইতেই হবে। বাবাকে বলে কোন লাভ হয়নি, শুধু বলে বেতন পেলে ব্যাটারি এনে দেবে। বেতন যে ছাই কবে হবে!

...স জ্ঞজ্ঞ ঋ জ্ঞ া সা ঋ ণ্ সস মজ্ঞ মপ জ্ঞম পণ দপ মজ্ঞ ঋস ... যা রে ...।

ভোরের রবির যে লাল আলো জানালার ফাঁক দিয়ে এসে তাদের বাবাকে আর তাদের পাশ কাটিয়ে খাটের পাশ দিয়ে বেড়ার উপরে পড়ছিল এখন তা হলদেটে হয়ে মাটির মেঝের উপরে গড়াতে শুরু করেছে। সেদিকে কয়েকবার তাকিয়ে দেখল গুরুদয়াল। তাকে কাজে যেতে হবে।
‘এখন থাক,’সে রিড চেপে বাতাশ বের করতে করতে বলল।
তার তিনজন উঠল। মালতি আলনা থেকে তার বাবার পোশাক স্নানের ঘরে রেখে এলো। তারপর মাটির মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে তেলের বাটি এনে রাখল। গুরুদয়াল নিচে নামল। কেতকী যূথির কাঁধে হাত রেখে বাবার দিকে তাকিয়েছিল।
‘বাবা, ব্যাটারি...,’শেষ পযর্ন্ত তার বলার সাহস হল। মালতি মুখে আঁচল চাপা দিল। সে হাসছে। জেদী মেয়েটা এবার হয়তো বকুনি শুনবে।
‘আনব মা,’তাদের বাবা বলল। ‘আজ কালকের ভিতরেই এনে দেব...।’কিন্তু তার মুখে চিন্তার রেখা।

তার বাবার সামনে এসে বসার পর থেকেই এই একটা কথা বলার জন্য মালতি ছটফট করেছে, কিন্তু মুখ দিয়ে বের করতে পারেনি। তার বুকের পাষাণ ভারটা কেতকী কত সহজে নামিয়ে দিল।

রান্নার কাজ শেষ। মালতি শোবার ঘর দুটো গোছগাছ করে সামনের বারান্দার বেঞ্চিতে এসে বসল।
যূঁথি একটু পরে এসে তার কোলে মুখ রেখে হাঁটু গেঁড়ে বাঁকা হয়ে বসল। মালতি তার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে আনমনে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকল। কেতকীটা বাবা বের হবার পরপরই বেরিয়ে গেছে। কখন তার ফিরে আসার মর্জি হবে কে জানে। তবে সে ফল-মূল ফুল বা যা হোক কিছু একটা আনবেই। আর তা যত সামান্যই হোক না কেন তিন জনে ভাগ করে নেবে।

বারান্দার সামনের কিছুটা জায়গা উঠোন আকারে ফাঁকা পড়ে আছে। আর তারপরে ফল আর জংলা নানান ধরণের গাছের একটা জংগলেরমত, তবে সেটা একেবারেই ঘণ নয়। এরপরে মাটির সড়ক, তারপর ফসলের খেত- যা শেষ হয়েছে নদীর তীরে। সেদিক থেকে হালকা ভাঙ্গা ভাঙ্গা একটা গানের শব্দ ভেসে আসতে থাকল, যেটা ক্রমশ্য বেড়ে চলেছে।

...ঠুংঠাং ঠুংঠাং চুড়ির তালে থৈ থৈ বন্যা নাচরে...রিমঝিম রিমঝিম বরষাতে ...জলতরঙ্গ ...।

একটু পরেই গাছের ফাঁক দিয়ে গানের উৎসটা দেখা গেল। একটা নৌকার ছইয়ের উপরে একটা মাইক। মাঝির কাছে সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরে কেউ একজন বসে আছে। সম্ভবত বিয়েটিয়ের ব্যাপার। করতে যাচ্ছে অথবা করে ফিরে আসছে। মালতি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। যূঁথি একবার মাত্র মাথা তুলে তার দিদির মুখের দিকে তাকিয়ে আবার কোলে মুখ গুঁজল। নৌকা গাছের আড়ালে হারাল, তারপরে গানও।

হঠাৎ করেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়তে শুরু করল।

‘...আয় বৃষ্টি ঝেপে...’মালতি নিজের অজান্তেই গান গেয়ে উঠল। সাথে সাথেই যূঁথি উঠে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মাথা নেড়ে তাল দিতে লাগল।

...টিনের বেড়ার ওপাশে দ্রুত চলার ছপছপ শব্দ আর সেই সাথে হিহি হাসি। পর মুহূর্তেই তাদের সামনে কেতকী এসে উপস্থিত। তার হাতে বুকের কাছে চেপে ধরা এক গোছা শাপলা আর গলায় তিনটে শাপলার মালা। সে টিনের চাল থেকে ঝরতে থাকা পানির নিচে এসে দাড়াল। ঝরে পড়া পানি তার ভেজা শরীরের ঘাড়ের পিছন, দুই কাঁধ আর পিছনের দিকটা আরো ভিজিয়ে চলল।

‘দিদি...হিহিহিহি...।’সে হাসির দমকে দুলতে থাকল। ‘...আয় বৃষ্টি ঝেপে... হিহিহিহি...।’
‘কী রে? কী হয়েছে?’গান থামিয়ে মালতি বলল। রাগ নয় তার উৎকন্ঠা হচ্ছে। পাগলিটার মাথায় কোন ভূত চেপেছে কে জানে।
‘বলে বৃষ্টিতে সারা দেশ ভেসে যাচ্ছে, আর তুই গান ধরেছিস আয় বৃষ্টি ঝেপে... হিহিহিহি...।’
‘দুর মুখপুড়ি...!’মালতি রাগতে গিয়ে হেসে ফেলল। ‘তা কী গান গাইব তুইই বল।’
‘শাওন এলো ওই...থৈ থৈ শাওন এলো ওই...।’মুহূর্তেই গলা ছেড়ে গান ধরল কেতকী। ‘...পথ হারা বৈরাগী রে তোর একতারাটা কই...?’সে হাতের বোঝাটা পায়ের কাছে ফেলে দিয়ে দুই হাত মালতির দিকে বাড়িয়ে দিল। মালাগুলো যেন জড়াজড়ি করে আনন্দে দুলে উঠল।

এক মুহূর্ত চিন্তা করে উঠে দাঁড়াল মালতি। যূঁথিকে পাশে সরিয়ে আঁচলটা শক্ত করে কোমরে জড়িয়ে নিয়ে নিচে নেমে এলো সে। ঘাড়ের কাছে পানির ফোটা পড়তেই তার শরীরটা শিরশির করে উঠল। সে সামনে বাড়ানো হাত দুটোকে নিজের দুই হাতে ধরে টেনে উঠোনের মাঝখানে নিয়ে গেল।

‘...ফুল ভরা কোন ভুল আঙ্গিনায় হায়রে ও বাউল...।’তারা দুজনে হাত ধরাধরি করে নাচের ভঙ্গিতে পায়ে তাল ঠুকেঠুকে ঘুরেঘুরে গাইতে লাগল।‘ও বাউল, ভিখ মাগনে গিছিলি তুই কোন...।’
আর বারান্দার একেবারে প্রান্তে এসে যূঁথি হাততালি দিয়ে লাফাতে লাগল।
‘কী মজা! কী মজা!!’

...আজকে গুরুদয়ালের শরীরটা বেশ অবসন্ন মনে হচ্ছিল। বাড়ি থেকে মাইল দেড়েক দূরের আড়তের পথটা আসতে তার বেশ কষ্ট হয়েছে। তবু সে ছাতাটা মুড়ে জায়গামত রেখে কাউকে কিছু না বলে কাজে লেগে গেছিল। কিন্তু দুপুরের খাওয়ার ছুটি হওয়ার একটু আগে মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছিল। মতি হাতের কাজ ফেলে তাড়াতাড়ি তাকে ধরল। যতিনবাবু ছুটে এলো তাদের দিকে।
‘তুমি আমার ওখানে গিয়ে একটু জিরিয়ে নাও হে,’ সে বলল। তোমাকে আজ আর কাজ করতে হবে না। বাড়ি চলে যেও। শরীর ভাল থাকলে কাল এসো। মতি, তুই সাথে যা। মিনুর মাকে বলিস...।’
‘না, না,’গুরুদয়াল ব্যস্ত ভাবে বলে উঠল। ‘এখানেই একটু বিশ্রাম নিয়ে..।’
‘আরে যাও না হে,’যতিনবাবু হেসে বলল। কিন্তু তার মুখে চিন্তার ছাপ। এই মানুষটাকে সে সত্যিই ভালবাসে। সে লক্ষ করেছে, দিনকে দিন গুরুদয়াল দুর্বল হয়ে পড়ছে। ‘তুমিতো ছুটিই নাও না হে। একটা সপ্তাহ নাহয় ছুটি কাটালে।’
গুরুদয়াল আর কিছু বলল না। আড়তের সাথেই বাড়ি, সে পা বাড়াল। যতিনবাবু তার সাথে বাইরে এলো। তাদের পিছুপিছু এলো মতি। গুরুদয়াল ঘুরে দাঁড়াল।
‘ব্যাটারি কেনার জন্য বেতনের কিছু টাকা যদি দিতেন।’
‘হ্যা...?’
‘মানে... কয়েক দিন আগে রেডিওর ব্যাটারি শেষ হয়ে গেছে,’ গুরুদয়াল একটু আমতা আমতা করে বলল। ‘মেয়েরা বলছিল...।’
‘আগে বলতে হয় সেটা? আমার মা লক্ষ্মীরা রেডিও শুনতে পারছেনা। আমি আনিয়ে রাখব, বাড়ি যাওয়ার সময় তুমি নিয়ে যেও। আর হ্যা, ব্যাটারির এবারের খরচটাও আমার।’

...তু মাইয়া হ্যায় প্রেমকি জ্যোতি হাম সব তেরে কীরণে...তেরে আঁচল কে ছায়েমে ঝরতে...।

গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকতেই তার কানে গান ভেসে এলো। ভজন। সে যতই এগিয়ে গেল, গান ততই জোরে হতে লাগল। দোতালার কোন একটা ঘরে রেডিওগ্রামে রেকর্ডে বা রেডিওতে বাজছে। যতিনবাবুর স্ত্রী ভজনের ভক্ত। হিন্দি বাংলা যেটাই হোক। গুরুদয়াল নিজে তাদের ঘরোয়া অনুষ্ঠানে তাকে বেশ কয়েকবার ভজন শুনিয়ে প্রশংসা পেয়েছে।

মতি তাকে বৈঠকখানা ঘরে নিয়ে তুলল। গান বাজনার বদৌলতে এই ঘরটা গুরুদয়ালের খুবই পরিচিত। বাথরুমের বেসিনে হাতমুখ ধুয়ে সে জাজিমের এক কোনায় হাত পা ছড়িয়ে বসে পড়ল। পরিচিত ঘর, বিশেষ করে গানটা তাকে অনেকটা শান্তি এনে দিতে পেরেছে।

...ম্যায় গোয়ালো রাখোওয়ালো মাইয়া মাখন নাহি চোরাও...। গান বেজে চলেছে- তার চোখে পানি এসে পড়েছে।
মতি ভিতরে চলে গেল। একটু পরেই এক গ্লাস দুধ এনে তাকে দিল।
আপনি থাকেন দাদা,’সে বলল। ‘একটু পরে খাবার আসবে, খেয়ে নেবেন। যতক্ষণ খুশি বিশ্রাম নিয়ে তারপরে বের হবেন।’তারপর তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নিজেই বের হয়ে গেল। সে হালকা গরম দুধে চুমুক দিল। তার কাছে সেটা অমৃত মনে হল। স্বর্গ। গান শেষ হল...।

...শ্যামসে নেহা লা গায়ে... রাধে নীঈঈর বাহায়ে... হায়... শ্যামসে নেহা লাগায়ে..। হায়...। তার চোখে ঘুম নেমে এলো। ... পিলি পড় গ্যায়ি কিশোর কায়া... রূপমে আপনা রূপ...। তারপর আর একটা।

সন্ধ্যার একটু আগে সে বাড়িতে এল। মালতির মুখ শুকিয়ে গেল- সামান্য যা কিছু রান্না করেছিল তার সবটুকুই তারা তিনজনে খেয়ে শেষ করেছে। বাবার কাছে জানতে চাইল ভাত রান্না করে দেবে কিনা
‘না মা, আমি খেয়ে এসেছি,’সে বলল। মালতির হাতে ব্যাটারি আর মিষ্টির ছোট একটা প্যাকেট দিল। ‘তোমরা খেও।’পোশাক বদলে হাতমুখ ধুয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল গুরুদয়াল।

সে কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল বলতে পারবেনা- হালকা গানের শব্দে তার ঘুম ভেঙ্গে গেল।
...মন উচাটন হরি দরশন লাগি...। পাশের ঘরে রেডিওতে বেজে চলেছে। সে একাগ্র ভাবে শুনে যেতে লাগল। তার খেয়াল নেই যে তার দুচোখের পানি বালিশটাকে ভিজিয়ে চলেছে। গান বন্ধ হল, তারপর রেডিওটাও। সে শুয়ে থাকল।

সন্ধ্যা হয়ে আসছে। টিনের বেড়ার ফাঁক দিয়ে আবীর রঙ্গা আলোর রেখা ঘরের ভিতরে আবছা অন্ধকারে নানান রকমের নকশা একে চলেছে। সে উঠে বসল। তারপর নিচে নেমে চৌকির নিচ থেকে হারমোনিয়ামটা উপরে তুলল। আর তখনি মালতি একটা জ্বলন্ত হারিকেন হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকল।
‘একটা গান গাই, মা?’ গুরুদয়াল হারমোনিয়ামের পিছনে বসতে বসতে বলল।
কাঠের খুঁটির একটা আংটায় হারিকেনটা রাখতে রাখতে মৃদু হেসে মাথা নাড়াল মালতি। সে খুশি হয়েছে। সে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

...স ন্ ঋ গ হ্ম প দ ন সঃ সঃ ন দ প হ্ম গ ঋ গ হ্ম গ স...। ন্ ঋ গ হ্মগ ঋ গ ম গ ঋ স...।
মুহূর্তের মধ্যেই তিন কন্যা দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। গুরুদয়াল চোখের ইঙ্গিতে তাদেরকে চৌকিতে এসে বসতে বলল। তাদের আর এসে বসতে দেরী হল না।

ন্ স ঋ গ ন্ ঋ গ হ্ম গ প ন্ ঋ গ হ্ম প হ্ম গ- খক খক- ঋ গ ম গ ঋ স...। ‘খক...।’
‘...মন উচাটন হরি দরশন লাগি...। মন উ...। ...খক খক খক...।’কাশতে কাশতে সে সামনে ঝুঁকে পড়ল। তার দুই ঠোঁটের কোনে হালকা ফেনার রেখা, কিন্তু দূরে থাকা হারিকেনের হালকা আলোয় তা কারো চোখে পড়লনা।

খক খক খক খক...। সে দুই পাশে হাত ছড়িয়ে হারমোনিয়ামের উপরে বুকের ভার চাপিয়ে দিল। হারিকেনের মৃদু আলো আরো মৃদু হতে হতে তার চোখ থেকে একেবারে হারিয়ে গেল। সে যেন গাঢ় অন্ধকারের ভিতরে দুলতে দুলতে তলিয়ে যেতে লাগল। তার মাথা সামনে ঝুলে পড়ল, চশমাটা আলগা হয়ে কপালের নিচে দুলতে থাকল।

শেষ শব্দ যেটা তার কানে পৌছাল সেটা যেন নদীর ওপার থেকে কেউ ক্ষীণ স্বরে তাকে ডাকল, ‘বাবা!’

কিন্তু মালতি তার জীবনে কখনই এমন চিৎকার করে কোন শব্দ উচ্চারণ করে নি...।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
মিলন বনিক ওয়াহিদ ভাই..আপনার গল্পের চরিত্রগুলো িখুব কাছে থেকে দেখা একেবারে জীবন্ত...একজন লেখক কতটা জীবন ঘনিষ্ঠ হলে এরকমটি লেখা সম্ভব তাই ভাবছি....অপুর্ব আপনার হাতের যাদু....অনেক অনেক শুভকামনা.....
Lutful Bari Panna একটা গায়কী পরিবারের আগাগোড়াই ট্রাজেডী। যার মাঝে গানই একমাত্র আনন্দ। অথচ গানেই শেষ হল শেষ ট্রাজেডীটি দিয়ে। আপনার লেখনি গল্পটাকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে ওয়াহিদ ভাই।
তানি হক খুব ভালো লাগলো ভাইয়া গল্পটি সংগীত প্রেমী বোন আর গুরুজির কাহিনী ।। শেষে এসে যদি ও মনটা খারাপ হয়ে গেলো... তার পর ও দারুণ গল্পটার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ আর সালাম
এশরার লতিফ একজন সঙ্গীত শিল্পীর জীবন ও পরিবারকে ঘিরে ভিন্ন স্বাদের গল্প। লক্ষীর থেকে সরস্বতীকেই পরিবারটি বেশী মুল্য দিয়েছে। খুব ভালো লাগলো।
তাপসকিরণ রায় লেখক গানের সরগমে অভিজ্ঞ--লেখা পড়ে তা ধরা যায়--কথা ভাব ভাষার সঠিক ধারাবাহিকতা ও লক্ষ্য করার মত।কাহিনী ভাল লেগেছে। তেমনি শেষের বিয়োগান্ত ব্যাপারটাও মনে রেখাপাত করে।ধন্যবাদ লেখককে।
Md. Akhteruzzaman N/A ওয়াহিদ ভাই সত্যি নিজে হারিয়ে গিয়ে আপনাকে হারাতে চাই না। আপনার সুন্দর সুন্দর লেখার মধ্যেই আপনাকে সব সময় পেতে চাই। অনেক অনেক ধন্যবাদ।
F.I. JEWEL N/A # বেদনার সুর তোলা দারুন একটা গল্প ।।
আরমান হায়দার ভাষার চিত্রকল্পে হারিয়ে গেছি।
ভাল লেগেছে জেনে আমারও ভাল লাগল। তবে ভাই, হারিয়ে গেলে চলবেনা, গ.ক.র একজনকেও আমি অন্তত হারাতে চাই না- বলতে পারেন এটা আমাদের অন্য এক রকমের পরিবার। পড়া আর মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ।
সুমন ওয়াহিদ ভাই গানের সাথে সম্পৃক্ত না থাকলে সারগাম গুলো এভাবে কেউ লিখে না, জানি না আপনি গান করেন কি না। খুব হৃদয়স্পর্শী, শেষটাতো একেবারে চোখ ভিজিয়ে দেয়ার মতো। পুরোটা শেষ করার পর মনে হলো যেন ঘটনাগুলো চোখের সামনেই ঘটেছে। মালতির মায়ের সম্পর্কে আরো কিছু জানতে ইচ্ছ হচ্ছিল। কারন উনি ছাড়াতো মনে হলো পুরো পরিবারই গান পাগল। আপনার বর্ণনা ভঙ্গি বেশ সুন্দর সাবলীল।
অতীতের কোন এক সময়ে গানে আগ্রহ ছিল, এখন নয়। গানে আপনার যদি আগ্রহ থাকে তবে বলি- আমার কবিতাগুলোকে গানে পরিণত করা সহজ। আর মালতির মা অবশ্যই গান ভালবাসতেন, তবে তারচেয়ে বেশী ভালবাসতেন নিজের পরিবারকে। ভাল লেগেছে জেনে আমারও ভাল লাগল। এতেই আমি তৃপ্ত। ধন্যবাদ সুমন ভাই।
মোঃ কবির হোসেন mohd wahid হুসাইন ভাই আপনার গল্পটি পড়ে সত্যি সেই গ্রামের অনেক আগের বাবার মায়ের সাথে এক সাথে কাটানো অনেক স্মৃতি মনে পড়ে গেল. গল্পটির মাঝে গ্রামের গন্ধ পেলাম. আর সব শেষে গল্পের পরিনতিতে বেদনায় মনটা কেমন যেন উদাস হয়ে গেল. অনেক ভাল লাগল গল্পটি. ধন্যবাদ.
প্রথম পাঠক হিসাবে প্রথমেই অনেক ধন্যবাদ। পড়া আর ম ন্তব্যের জন্য আবারও। ভাল লেগেছে জেনে আমারও ভাল লাগল।

০৪ জুলাই - ২০১১ গল্প/কবিতা: ৫৭ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ”
কবিতার বিষয় "তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ এপ্রিল,২০২৬